রাত দুইটা। থার্মোমিটারে ১০১ ডিগ্রি। বাচ্চা গরম, কান্নাকাটি করছে। এখন কি হাসপাতালে নিয়ে যাবেন, নাকি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন?
এই প্রশ্নটা প্রায় প্রতিটা বাবা-মাকেই একবার হলেও ভাবায়। জ্বর নিজে কোনো রোগ নয় — এটা শরীরের প্রতিরক্ষার একটা সংকেত। বেশিরভাগ জ্বর ঘরে সামলানো যায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।
শিশুর জ্বর কত হলে জ্বর বলা হয়?
বগলে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (প্রায় ১০০.৪ ফারেনহাইট) বা তার বেশি হলে সেটা জ্বর। থার্মোমিটার দিয়ে মাপুন — হাত দিয়ে আন্দাজ করা ভুল ফল দেয়, বিশেষ করে ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে।
আরেকটা জিনিস মনে রাখবেন — জ্বরের সংখ্যা যত বেশি, রোগ তত গুরুতর, এমন নয়। ১০২ ডিগ্রি জ্বরও সাধারণ ভাইরাসে হতে পারে, আবার কম জ্বরও বড় সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। আসল নির্ভর করে শিশুর বয়স আর অন্য লক্ষণের ওপর।
কোন বয়সে জ্বর মানেই দ্রুত ডাক্তার?
এটা খুব জরুরি — তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর হলে ঘরে বসে অপেক্ষা করবেন না। এই বয়সে শিশু নিজের অসুস্থতা বোঝাতে পারে না, আর গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যান।
তিন মাসের বেশি বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে প্রথমে শিশুকে দেখুন — খেলছে কি না, দুধ খাচ্ছে কি না, প্রস্রাব হচ্ছে কি না।
ঘরে বসে কী করবেন?
- হালকা পোশাক পরান। জ্বরের সময় শিশুকে মোটা কম্বলে মুড়ে ফেলবেন না — এতে শরীর আরও গরম হয়।
- বেশি করে তরল দিন। দুধ, পানি, খাবার স্যালাইন। জ্বরে পানি কমে যায়।
- ঘর ঠান্ডা রাখুন। ফ্যান চালান, তবে সরাসরি গায়ে নয়।
- হালকা গরম পানি দিয়ে গা মুছে দিন। বরফ বা ঠান্ডা পানি ব্যবহার করবেন না — এতে কাঁপুনি শুরু হতে পারে।
- বিশ্রাম দিন। স্কুল বা খেলার জন্য জোর করবেন না।
জ্বরনাশক ওষুধ দিতে হলে শিশুর ওজন অনুযায়ী মাত্রা জেনে নিন — ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের কাছ থেকে। প্রাপ্তবয়স্কের ট্যাবলেট ভেঙে অর্ধেক দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। আর বড়দের কিছু ব্যথানাশক শিশুদের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ।
জ্বরের সাথে কাঁপুনি বা চোখ উল্টে যাওয়া
কিছু শিশুর জ্বরের সাথে খিঁচুনি হয়, একে বলে ফেব্রিল কনভালশন। দেখতে ভয়ংকর লাগে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থায়ী কোনো ক্ষতি করে না।
তখন যা করবেন — শিশুকে মেঝে বা বিছানায় কাত করে শোয়ান, আশপাশ থেকে ধারালো জিনিস সরান, জামার বোতাম খুলে দিন। মুখে কিছু ঢোকাবেন না, জোর করে ধরে রাখবেন না। কতক্ষণ স্থায়ী হলো সময় দেখুন। পাঁচ মিনিটের বেশি হলে বা বারবার হলে হাসপাতালে যান।
প্রথমবার এমন হলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাবেন।
কখন দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন?
- তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর
- জ্বর ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং ওষুধেও কমছে না
- টানা তিন দিনের বেশি জ্বর
- শিশু খুব ঝিমাচ্ছে, সহজে জাগছে না
- দুধ খাওয়া অনেক কমে গেছে, প্রস্রাব কমে গেছে
- শ্বাস নিতে কষ্ট, বুক ডেবে যাওয়া, ঠোঁট নীল হওয়া
- শরীরে লাল বা বেগুনি রঙের দাগ যা চাপ দিলে মিলিয়ে যায় না
- ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আলোতে চোখ কুঁচকানো
- খিঁচুনি হলে
শেষ কয়েকটা লক্ষণ গুরুতর সংক্রমণের সংকেত হতে পারে। এগুলো থাকলে ঘরে টোটকা নিয়ে সময় নষ্ট করবেন না।
জ্বর কি সবসময় খারাপ?
না। জ্বর হলো শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ — শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে এটি জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাই জ্বরকে সম্পূর্ণ দমন করার চেষ্টা না করে শিশুর আরামের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
তবে অস্বস্তি কমাতে জ্বরনাশক দেওয়া যায়, ঠিক মাত্রায়।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
জ্বরের সময় গোসল করানো যাবে?
যাবে, হালকা গরম পানি দিয়ে। শুধু ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করবেন না।
জ্বর হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে?
না। বেশিরভাগ শিশুর জ্বর ভাইরাসের কারণে হয়, আর ভাইরাসে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বিপজ্জনক।
টিকা দেওয়ার পর জ্বর এলে কী করব?
এটা সাধারণ এবং এক-দুই দিনেই সারে। বিস্তারিত দেখুন শিশুর টিকার সূচি লেখায়।
শেষ কথা — এই লেখাটা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসার বিকল্প নয়। শিশুর জ্বর নিয়ে সন্দেহ হলে বা আপনার মন বলছে কিছু ঠিক নেই — সেটা বিশ্বাস করুন এবং ডাক্তারের কাছে যান। সন্দেহ নিয়ে রাত জেগে বসে থাকার চেয়ে একবার দেখিয়ে আসা ভালো।