টিকার কার্ডটা হারিয়ে গেছে — এই ভয় অনেক মায়েরই থাকে। আবার উল্টো ভয়ও আছে: "এতগুলো টিকা একসাথে দিলে বাচ্চার কী হবে?" দুটো ভয়ই স্বাভাবিক, আর দুটোরই উত্তর আছে।
বাংলাদেশে সরকারি ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় শিশুদের টিকা সম্পূর্ণ ফ্রি। হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক বা টিকাকেন্দ্রে গেলেই দেওয়া হয়। এই লেখায় সূচিটা সহজ করে সাজিয়ে দিচ্ছি, সাথে কোনটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা দরকার আর কোনটা নয়।
শিশুর টিকা কখন কখন দিতে হয়?
সাধারণভাবে সূচিটা এভাবে চলে —
- জন্মের দিনেই: বিসিজি, হেপাটাইটিস-বি (প্রথম ডোজ) এবং ওরাল পোলিও।
- ৬ সপ্তাহে: পেন্টাভ্যালেন্ট (ডিপিটি + হেপাটাইটিস-বি + হিব) প্রথম ডোজ, ওরাল পোলিও, নিউমোকক্কাল (পিসিভি) এবং রোটা ভাইরাসের প্রথম ডোজ।
- ১০ সপ্তাহে: একই টিকাগুলোর দ্বিতীয় ডোজ।
- ১৪ সপ্তাহে: তৃতীয় ডোজ।
- ৯ মাসে: হাম-রুবেলা (এমআর) প্রথম ডোজ।
- ১৫ মাসে: এমআর দ্বিতীয় ডোজ এবং পিসিভির বাকি ডোজ।
- ১৮ মাসে: বুস্টার ডোজ।
সূচি সময়ে সময়ে সামান্য বদলায়, আর কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ কারণেও বদলাতে পারে। তাই আপনার টিকার কার্ডটাই শেষ কথা — কার্ডে যা লেখা, সেটাই মানুন। কার্ড হারালে নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্রে গিয়ে নতুন কার্ড নিতে পারবেন।
টিকা দিতে দেরি হয়ে গেলে কী হবে?
অনেকেই ভাবেন একদিন দেরি হলে টিকাটা আর কাজ করবে না। এটা ঠিক নয়। দেরি হলে টিকা বাতিল হয় না — শুধু বাকি ডোজগুলোর সময়ও পিছিয়ে যায়।
তবে দেরি করলে শিশু সেই সময়টা রোগের ঝুঁকিতে থাকে। যেমন হাম খুব সহজে ছড়ায়, আর হামে শিশুর মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। তাই "পরে দেব" ভেবে ফেলে রাখার চেয়ে যত দ্রুত সম্ভব গিয়ে দিয়ে আসা ভালো।
যে টিকা বাদ পড়েছে, সেটা শুরু থেকে আবার দিতে হয় না — যেখানে থেমেছিলেন, সেখান থেকেই এগোয়। এটা নিয়ে নিজে হিসাব না কষে কেন্দ্রে গিয়ে বলুন কোনটা বাদ পড়েছে।
একসাথে এত টিকা দিলে শিশুর ক্ষতি হয় না?
হয় না। একসাথে কয়েকটা টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সব জায়গায় স্বীকৃত, আর বহু বছর ধরে সারা দেশে এভাবেই দেওয়া হচ্ছে। একসাথে দিলে শিশুকে বারবার ক্লিনিকে আসতে হয় না — এটাই এর সুবিধা।
অনেকে ভাবেন শরীর এত টিকা একসাথে সামলাতে পারবে না। কিন্তু শিশুর শরীর প্রতিদিন হাজারো জীবাণুর সংস্পর্শে আসে, আর টিকা তার চেয়ে অনেক ছোট একটা চ্যালেঞ্জ।
টিকা দেওয়ার পর জ্বর এলে কী করবেন?
হালকা জ্বর, পায়ে ব্যথা বা ইনজেকশনের জায়গায় লালচে ভাব — এগুলো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সাধারণত এক-দুই দিনেই সেরে যায়।
- শিশুকে বেশি করে দুধ বা পানি দিন।
- হালকা পোশাক পরান, ঘর বেশি গরম করবেন না।
- জ্বরmeasuring করার জন্য থার্মোমিটার ব্যবহার করুন, হাত দিয়ে আন্দাজ নয়।
- জ্বরনাশক ওষুধ দিতে হলে শিশুর ওজন অনুযায়ী মাত্রা জানতে হবে — নিজে আন্দাজে দেবেন না, ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের কাছে জেনে নিন।
ইনজেকশনের জায়গায় ফুলে গেলে ঠান্ডা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে পারেন, তবে ঘষবেন না।
কখন টিকার পর ডাক্তারের কাছে যাবেন?
- জ্বর ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বা তিন দিনের বেশি থাকলে
- শিশু খুব কান্নাকাটি করলে এবং কিছুতেই থামাতে না পারলে
- শ্বাস নিতে কষ্ট, ঠোঁট ফুলে যাওয়া বা শরীরে চাকা চাকা দাগ হলে
- অতিরিক্ত ঘুম বা সহজে জাগে না
শেষ দুটো খুব বিরল, কিন্তু হলে সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে হবে।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
টিকা দেওয়ার দিন গোসল করানো যাবে?
যাবে। ইনজেকশনের জায়গাটা শুধু ভালোভাবে শুকিয়ে রাখুন।
শিশুর হালকা সর্দি-কাশি থাকলে টিকা দেওয়া যাবে?
সাধারণ সর্দি-কাশিতে সাধারণত টিকা দেওয়া বন্ধ করতে হয় না। তবে জ্বর থাকলে বা শিশু খুব দুর্বল লাগলে কেন্দ্রের কর্মীর সাথে কথা বলুন।
টিকার কার্ড হারিয়ে গেলে কী করব?
নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে জানান। রেকর্ড থাকলে নতুন কার্ড করে দেওয়া হয়।
টিকা কি সম্পূর্ণ ফ্রি?
সরকারি ইপিআই কর্মসূচির সব টিকা ফ্রি। বেসরকারি হাসপাতালে কিছু টিকা (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকেনপক্স) আলাদা টাকায় দেওয়া হয় — সেগুলো ইপিআই সূচির বাইরে।
শেষ কথা — এই লেখাটা সাধারণ তথ্যের জন্য। টিকার সূচি ও শিশুর অবস্থা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ইপিআই কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী বা আপনার শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। টিকা নিয়ে কারও মুখে শোনা গুজবের চেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বেশি বিশ্বাস করুন।