হাসপাতাল থেকে বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর প্রথম রাতটা অনেক মায়ের জীবনের সবচেয়ে ভয়ের রাত। বাচ্চা শ্বাস নিচ্ছে কি না বারবার দেখতে ইচ্ছা করে, একটু কাঁদলেই বুক ধড়ফড় করে। এই অনুভূতি নতুন মায়ের প্রায় সবারই হয়।
ভালো খবর হলো, নবজাতকের যত্ন আসলে কয়েকটা মৌলিক নিয়ম মেনে চলার ব্যাপার। কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা নয় — এই পার্থক্যটা জানা থাকলেই বেশিরভাগ ভয় কেটে যায়।
শিশুকে দিনে কতবার দুধ খাওয়াতে হবে?
জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধই যথেষ্ট — পানি, চিনির পানি বা বাইরের দুধের কোনো দরকার নেই।
নবজাতক দিনে ৮ থেকে ১২ বার দুধ খায়, মানে প্রায় প্রতি দুই-তিন ঘণ্টায়। অনেক মা ভাবেন এত ঘন ঘন খাওয়ানো বুঝি ঠিক হচ্ছে না — আসলে এটাই স্বাভাবিক। শিশুর পেট ছোট, তাই অল্প অল্প করে বারবার লাগে।
ক্ষুধা পেলে শিশু নিজেই জানান দেয় — জেগে ওঠে, ঠোঁট চালায়, হাত মুখে নেয়। কান্না হলো ক্ষুধার শেষ লক্ষণ, তাই কান্নার জন্য অপেক্ষা করবেন না।
শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে কি না বুঝবেন দুইটা জিনিসে — দিনে অন্তত ৬ বার প্রস্রাব, আর নরম পায়খানা। ওজনও সপ্তাহে বাড়ছে দেখলে নিশ্চিন্ত থাকুন।
নবজাতক দিনে কত ঘণ্টা ঘুমায়?
১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। এত ঘুমানো একদম স্বাভাবিক, তাই "বাচ্চা বুঝি বেশি ঘুমাচ্ছে" ভেবে চিন্তা করবেন না। তবে ঘুমের নিয়মের চেয়ে নিরাপত্তা বেশি জরুরি।
- শিশুকে সবসময় চিত শোয়ান, পেটে নয়।
- বালিশ, মোটা কম্বল বা নরম খেলনা খাটে রাখবেন না — শ্বাস আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- মায়ের সাথে একই বিছানায় ঘুমালে শিশু চাপা পড়ার ঝুঁকি থাকে। পাশে ছোট খাট বা দোলনা অনেক নিরাপদ।
- ঘর বেশি গরম করবেন না। স্বাভাবিক তাপমাত্রাই যথেষ্ট।
নাড়িতে কী লাগাবেন, কী লাগাবেন না
নাড়ি শুকিয়ে পড়ে যেতে সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন লাগে। এই সময়ে শুধু দুইটা কাজ — শুকনো রাখা আর পরিষ্কার রাখা।
গোসলের সময় ভিজে গেলে পরিষ্কার শুকনো কাপড়ে আলতো করে মুছে নিন। নাড়িতে তেল, হলুদ বা যেকোনো গুঁড়ো লাগাবেন না — এগুলো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
নাড়ির চারপাশে লালচে ভাব, ফোলা, গন্ধ বা পুঁজ দেখলে দেরি করবেন না।
গোসল কি প্রতিদিন দিতে হবে?
না। সপ্তাহে দুই-তিনবার গোসলই যথেষ্ট, বাকি দিনগুলোতে নরম ভেজা কাপড়ে মুছে দিলেই হয়। পানি হালকা গরম হবে, ঘর বন্ধ থাকবে, আর গোসলের সময় ৫ মিনিটের বেশি নয়।
শিশুর ত্বক অনেক পাতলা, তাই বড়দের সাবান বা ক্রিম ব্যবহার করবেন না। শিশুর জন্য তৈরি মাইল্ড ক্লিনজারই যথেষ্ট।
শিশু কাঁদলে কী করবেন?
নবজাতকের কান্না এক ধরনের ভাষা। সাধারণত পাঁচটা কারণ থাকে — ক্ষুধা, ভিজে ডায়াপার, ঘুমের সমস্যা, গরম-ঠান্ডা, আর কোলে নেওয়ার ইচ্ছা।
একটা একটা করে দেখুন — দুধ, ডায়াপার, গা গরম কি না, তারপর কোলে নিন। অনেক সময় শিশু শুধু গায়ের উষ্ণতা আর মায়ের শব্দ চায়।
টানা কাঁদলে আর কোনো কিছুতেই থামছে না — তখন অন্য কারণ খুঁজতে হবে। আর কান্নার সাথে জ্বর বা শ্বাসে সমস্যা থাকলে অপেক্ষা করবেন না।
ডায়াপার ও র্যাশ
ভিজে ডায়াপার দ্রুত বদলান — দিনে ৮ বার পর্যন্ত স্বাভাবিক। প্রতিবার বদলানোর সময় হালকা গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। লালচে দাগ বা ফুসকুড়ি হলে কিছুক্ষণ ডায়াপার ছাড়া রাখুন, সাধারণত এতেই সেরে যায়।
কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো একটি থাকলেই দেরি করবেন না —
- জ্বর (শিশুর ক্ষেত্রে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি)
- দুধ খাওয়া হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া
- শরীর বা চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
- শ্বাস নিতে কষ্ট, বুক ডেবে যাওয়া, ঠোঁট নীল হওয়া
- অতিরিক্ত ঘুম, সহজে জাগে না
- নাড়ির চারপাশে লাল হয়ে ফুলে যাওয়া
- বারবার বমি, বিশেষ করে সবুজ বা হলুদ রঙের
টিকার সময়সূচি মিস করবেন না
বাংলাদেশে জন্মের পরপরই বিসিজি, হেপাটাইটিস-বি এবং ওরাল পোলিও দেওয়া হয়। পরের ডোজগুলো নির্ধারিত তারিখে দিতে হবে। টিকার কার্ড সবসময় সঙ্গে রাখুন — হারিয়ে গেলে পরে সমস্যা হয়।
টিকা দেওয়ার পর হালকা জ্বর বা পায়ে ব্যথা হতে পারে, এটা স্বাভাবিক। তবে বেশি জ্বর বা অন্য কোনো লক্ষণ হলে ডাক্তারকে জানান।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
জন্মের পর ওজন কমে যাওয়া কি স্বাভাবিক?
স্বাভাবিক। প্রথম কয়েকদিনে ওজনের ৭–১০% কমতে পারে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আবার বাড়তে শুরু করে।
নাড়িতে পানি লাগলে ক্ষতি হবে?
ভিজলে ক্ষতি নেই, শুধু ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। ভেজা অবস্থায় রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
শিশুকে কখন গোসল করাবেন?
খাওয়ানোর অন্তত আধা ঘণ্টা পর। খাওয়ানোর সাথে সাথে বা খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় নয়।
নবজাতককে কতবার কোলে নেওয়া উচিত?
যতবার মনে হয়। কোলে নিলে শিশু অতিরিক্ত অভ্যস্ত হয়ে যাবে — এই ধারণাটা ভুল। উল্টো, কোলে থাকলে শিশু বেশি নিরাপদ বোধ করে।
শেষ কথা — এই লেখাটা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসার বিকল্প নয়। শিশুর কোনো লক্ষণ নিয়ে সন্দেহ হলে বা আপনার মনে ভয় জাগলে দেরি না করে ডাক্তার বা নিকটস্থ হাসপাতালে যান। সন্দেহ নিয়ে বসে থাকার চেয়ে একবার দেখিয়ে আসা অনেক ভালো।