রাত দুইটা। হঠাৎ করে রক্তপাত শুরু হয়েছে। পরিবারের সবাই ভাবছে, “সকাল হলে দেখা যাবে।” অথচ এই কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
গর্ভাবস্থায় অনেক উপসর্গই স্বাভাবিক — বমি বমি ভাব, পিঠে ব্যথা, পা ফোলা। কিন্তু কয়েকটা লক্ষণ আছে যেগুলো শরীরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা। সেগুলো চিনে রাখলে দেরি হবে না।
রক্তপাত বা তরল পানি যাওয়া
যেকোনো সময়ে যোনিপথে রক্তপাত হলে — অল্প হলেও — ডাক্তারকে জানাতে হবে। শেষ মাসগুলোতে অল্প রক্তপাত অনেক সময় প্লাসেন্টার সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
আর যদি পানির মতো তরল চলে যায়, মনে হয় প্রস্রাব নয় — সেটা পানি ভাঙার লক্ষণ হতে পারে। তখন গোসল করা বা অপেক্ষা করা নয়, সোজা হাসপাতালে।
তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা, হাত-মুখ ফুলে যাওয়া
এই তিনটা একসঙ্গে এলে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হয়। এগুলো প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণ হতে পারে — গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার একটা জটিল অবস্থা, যা ডাক্তারের নজরে না এলে মা আর শিশু দুজনের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রতিদিন একবার নিজের হাত আর মুখ দেখে নিন। আংটি হঠাৎ খুলতে না এলে, বা চোখের সামনে আলো ঝলসে উঠলে — দেরি করবেন না।
পেটে তীব্র ব্যথা
হালকা টান লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু তীব্র, একটানা ব্যথা — বিশেষ করে পেটের এক পাশে, বা পেট শক্ত হয়ে যাওয়া — জরুরি। এতে প্লাসেন্টার সমস্যা বা অন্য কিছু থাকতে পারে।
শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া
শিশুর নড়াচড়া হলো সবচেয়ে সহজ সংকেত। সাধারণত ২৮ সপ্তাহের পর নড়াচড়ার একটা নিজস্ব ছন্দ তৈরি হয়। যদি হঠাৎ করে ছন্দটা কমে যায়, বা সারাদিনে খুব কম নড়ে — এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে বাঁ দিকে শুয়ে এক ঘণ্টা দেখুন। তবু কম মনে হলে হাসপাতালে যান। এখানে “কাল দেখি” বলা যায় না।
জ্বর আর প্রস্রাবে জ্বালা
গর্ভাবস্থায় জ্বরকে সাধারণ ঠান্ডা ভেবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। প্রস্রাবে জ্বালা বা ঘন ঘন প্রস্রাব হলে সেটাও জানান — গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের সংক্রমণ প্রায়ই প্রসবের আগে জটিলতা তৈরি করে।
খিঁচুনি হলে
এটা সবচেয়ে জরুরি অবস্থা। খিঁচুনি এলে রোগীকে শোয়ানো, আশপাশের ধারালো জিনিস সরানো, আর সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা — মুখে কিছু ঢোকানোর চেষ্টা করবেন না।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে যা ঠিক রাখবেন
- কাছের হাসপাতালের নম্বর ফোনে সেভ করে রাখুন, খুঁজতে সময় নষ্ট হবে না।
- টাকা বা কার্ড একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখুন, যাতে রাতে বেরোনোর সময় খোঁজাখুঁজি না লাগে।
- কে সঙ্গে যাবে, সেটা এখনই ঠিক করে রাখুন — একজনের ফোন যেন সবসময় চালু থাকে।
- আগের পরীক্ষার কাগজ একটা ফাইলে রাখুন।
প্রসবের তারিখ হিসাব করতে প্রসবের তারিখ ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন, আর গর্ভাবস্থায় কী খাবেন সে জন্য খাদ্য তালিকার লেখাটা দেখে নিন।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
অল্প রক্তপাত হলে অপেক্ষা করা যায়?
না। অল্প হলেও জানানো দরকার, কারণ কতটুকু “অল্প” সেটা বাইরে থেকে বিচার করা যায় না। ডাক্তারই ঠিক করবেন পরীক্ষা লাগবে কি না।
শিশু কম নড়ছে, কিন্তু ব্যথা নেই — চিন্তার কিছু?
হ্যাঁ, নড়াচড়া কমে যাওয়া নিজেই একটা কারণ। ব্যথা না থাকলেও একবার পরীক্ষা করিয়ে নিন।
প্রতিদিন কী দেখে রাখা উচিত?
রক্তপাত, মাথাব্যথা, হাত-মুখ ফোলা, জ্বর, আর শিশুর নড়াচড়া — এই পাঁচটা। মনে রাখা কঠিন হলে কাগজে লিখে রাখুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। গর্ভাবস্থায় যেকোনো সন্দেহ হলে আপনার ডাক্তার বা হাসপাতালই শেষ কথা।