বন্ধুদের আড্ডায় প্রায়ই একজন বলে ওঠে — “আমার তো কিছু হয় না, জীবনে ডাক্তার দেখানোই লাগেনি।” কথাটা গর্বের মতো শোনালেও আসলে এটা একটা ফাঁকা জায়গা। শরীর খারাপ হলে টের পাওয়া যায়, কিন্তু রক্তচাপ বা সুগার অনেক দিন নীরবে বাড়তে থাকে। টের পাওয়ার আগেই ক্ষতি হয়ে যায়।
ত্রিশের পরে হিসাবটা কেন বদলে যায়
বিশের দশকে রাত জেগে কাজ করলেও সকালে শরীর ঠিক হয়ে যেত। ত্রিশের পরে সেই ধৈর্য কমে আসে। ওজন সহজে বাড়ে, সহজে কমে না। রক্তচাপ ধীরে ধীরে উপরে ওঠে। রক্তে সুগার বাড়ার প্রবণতাও এখান থেকেই শুরু।
বিষয়টা বয়সের সংখ্যা নয়, অভ্যাসের জমা। দিনে আট ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা, বাইরের ভাজাপোড়া, ধূমপান, ঘুম কম — এসবের হিসাব দশ বছর পরে গিয়ে দেখা যায়।
বছরে একবার যেগুলো করিয়ে নেবেন
- রক্তচাপ। এটা মাপতে দামি পরীক্ষা লাগে না। বছরেও একবার ডাক্তারের কাছে মাপিয়ে নিন, ঘরে মেশিন থাকলে মাসে একবার। উপরের চাপ ১৪০ বা নিচের চাপ ৯০-এর বেশি এলে ডাক্তারকে দেখান।
- রক্তে সুগার। খালি পেটে ৭.০ mmol/L বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিসের কথা ভাবা হয়। পরিবারে ডায়াবেটিস থাকলে এই পরীক্ষাটা ত্রিশ পেরোনোর পর থেকেই বছর বছর করা উচিত।
- কোলেস্টেরল (লিপিড প্রোফাইল)। শরীরে কোনো লক্ষণ থাকে না, অথচ রক্তনালি সরু হতে থাকে। পরিবারে হার্টের রোগ থাকলে এটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
- ওজন আর কোমরের মাপ। শুধু ওজন নয়, কোমরটাই বেশি বলে। পুরুষের কোমর ৯০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে পেটের ভেতরের চর্বি বেশি, সেটা হার্ট আর সুগারের জন্য ঝুঁকি।
- দাঁত আর চোখ। বছরেও একবার দাঁতের ডাক্তার, আর চোখের পরীক্ষা। দাঁতের মাড়ির প্রদাহ রক্তে সুগারের সঙ্গে জড়িত।
চল্লিশের পরে যা যোগ হবে
বয়স চল্লিশ ছাড়ালে পরিবারের ইতিহাস দেখে ডাক্তার হয়তো ইসিজি বা হার্টের অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন। আর প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া, বার বার উঠতে হওয়া, প্রস্রাব শেষ না হওয়ার অনুভূতি — এসব হলে প্রোস্টেট নিয়ে আলোচনা করা দরকার। এগুলোর জন্য আলাদা করে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক না।
রক্তশূন্যতা বা ভিটামিন ডি-র ঘাটতি অনেকের মধ্যেই থাকে, বিশেষ করে যাঁরা দুপুরে ঘরের বাইরে বেরোন না। ক্লান্তি দীর্ঘদিন থাকলে রক্তের সাধারণ পরীক্ষাটা করিয়ে নিন।
ঘরে বসেই যা মাপতে পারেন
মহিনার এক দিন ঠিক করে নিজের ওজন আর কোমরের মাপ লিখে রাখুন। কাগজে লিখলেই হবে, দামি অ্যাপ লাগে না। তিন মাস পরে ওই কাগজটা দেখলেই বোঝা যাবে দিকটা কোন দিকে যাচ্ছে।
নিজের ওজন আর উচ্চতা দিয়ে বিএমআই বের করতে পারেন বিএমআই ক্যালকুলেটর দিয়ে। পানির হিসাব ঠিক আছে কি না দেখতে পানি গ্রহণের ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে।
কখন পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করবেন না
বছরের পরিকল্পিত পরীক্ষা আর জরুরি অবস্থা আলাদা জিনিস। নিচের যেকোনো একটা হলে হাসপাতালে যান, “দেখি কয়েকদিন” ভাববেন না:
- বুকে চাপ, চেপে ধরা ব্যথা, যা বাম হাত বা চোয়ালে ছড়ায়
- হঠাৎ করে অনেকটা ওজন কমে যাওয়া, কারণ ছাড়াই
- প্রস্রাবে জ্বালা, রক্ত, বা প্রস্রাব আটকে যাওয়া
- শ্বাস নিতে কষ্ট, শুয়ে থাকলে বাড়ে
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
পরিবারে কেউ নেই, তবু পরীক্ষা দরকার?
দরকার। পারিবারিক ইতিহাস একটা ঝুঁকি, একমাত্র ঝুঁকি নয়। খাওয়া, ঘুম, কাজের চাপ আর ধূমপান — এগুলোও সমান হিসাব রাখে।
সকালে খালি পেটে যেতে হবে?
সুগার আর কোলেস্টেরলের পরীক্ষার জন্য সাধারণত ৮–১০ ঘণ্টা কিছু না খেয়ে যেতে হয়। তবে কোন পরীক্ষা করছেন, সেটা ল্যাবেই বলে দেবে। আগের রাতে জেনে রাখলে সকালে সময় নষ্ট হবে না।
ধূমপান ছাড়ার পর কি ক্ষতি ফিরে আসে?
ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকার শুরু হয়, সেটা বয়স যতই হোক। কত দিনে কী বদলাবে, সেটা ডাক্তার আপনার অবস্থা দেখে বলবেন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো ব্যক্তিগত পরামর্শ নয়। নিজের পরীক্ষার তালিকা ঠিক করবেন ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে।